দুই হাতে লেখা

জাস্ট এ থিওরি | জানুয়ারি 29, 2010

বিবর্তনকে উদ্দেশ্য করে সৃষ্টিবাদীদের করা সবচেয়ে প্রচারিত সন্দেহ, বিবর্তন শুধুই একটি তত্ত্ব, এর কোনও বাস্তবতা নেই। সত্যিই কি তাই? বিজ্ঞানীরা বাস্তবে ঘটেনা, এমন কোনও কিছু নিয়ে কখনও তত্ত্ব প্রদান করেন না। কোন পর্যবেক্ষণ যখন বারংবার বিভিন্নভাবে প্রমানিত হয় তখন তাকে আমরা বাস্তবতা বা সত্য (fact) বলে ধরে নেই।

প্রাণের বিবর্তন ঘটছে। প্রতিটি প্রজাতি স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করা হয়নি, বরঞ্চ প্রাণের উদ্ভবের পর থেকে প্রতি নিয়ত পরিবেশের বিভিন্ন প্রভাবের কারণে এক প্রজাতি বিবর্তিত হয়ে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এইপরা রাতে ঘুমালো, সকালে উঠে দেখলো তারা সবাই হোমোসেপিয়েন্স এ রুপান্তরিত হয়ে গেছে- এমন না, এটি লক্ষ বছরে পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের ফসল। প্রজাতি এক রূপ থেকে আরেক রূপে বিবর্তিত হতে পারেনা, এটা এই যুগে এসে মনে করাটা পাপ, যখন দেখা যায়, চৈনিকরা যোগাযোগ খরচ বাচানোর জন্য গোল, গোল তরমুজকে চারকোণা করে ফেলেছে। কবুতর, কুকুরের ব্রিডিং সম্পর্কেও আমরা সবাই অবগত। মাত্র কয়েক প্রজন্মেই এক প্রজাতির কুকুর থেকে আরেক প্রজাতির উদ্ভব হয়, সেখানে পরিবেশ পেয়েছে লক্ষ- কোটি বছর। বিবর্তনের যে বাস্তব এই প্রমান দেখতে আগ্রহীদের জন্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেলের নির্মিত প্রামান্য চিত্র ‘ওয়াজ ডারউইন রং’, চ্যনেল ফোরের ‘জিনিয়াস অফ চার্লস ডারউইন’, অক্সফোর্ড প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্সের ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ (২০০৯) বইটি সহায়ক হতে পারে।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বিবর্তন ঘটে। পাহাড় সমান প্রমান, ফসিল, ডিএনএ -র আবিষ্কার প্রমান করে, এটা বাস্তব। আমরা জানি, পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করার জন্যই প্রয়োজন হয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের। যেমনঃ গাছ থেকে আপেল পড়ে, এটি একটি বাস্তবতা, একে ব্যাখ্যা করা হয় নিউটনের মহার্কষ তত্ত্ব দ্বারা। তত্ত্ব কোনও সাধারণ বাক্য নয়, বাস্তবতার ব্যখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে একটি হাইপোথিসিস বা অনুমিত তত্ত্ব দাঁড় করান। পরবর্তীতে এই অনুমিত তত্ত্বকে পর্যবেক্ষণ লব্ধ জ্ঞান, অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সূত্রের মাধ্যমে আঘাত করা হয়। যদি সকল আঘাত থেকে যুক্তিযুক্ত ভাবে একটি অনুমিত তত্ত্ব বেঁচে ফিরতে পারে এবং যখন প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ প্রমান একে সমর্থন করে তখন একে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব উপাধি দেওয়া হয়। বিবর্তনকে যে তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, তার নাম ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব’।

প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব নিয়ে ডারউইন একদিকে যেমন নিঃসংশয় ছিলেন অপরদিকে ছিলেন দ্বিধাগ্রন্থ। কারণ লক্ষ- কোটি প্রজাতির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির এই তত্ত্বের বাইরে উদ্ভব হওয়া এই তত্ত্বকে বাতিল করে দিতে যথেষ্ট। দীর্ঘ বিশ বছর বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহের পর একটি বিশেষ ঘটনার কারণে ডারউইন ১৮৫৮ সালে তত্ত্বটি প্রকাশ করেন। তারপর থেকেই বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানীদের ছুরির নীচে। গত দেড়শ বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে বিবর্তন তত্ত্বকে পরীক্ষা করা হয়েছে, এটি কখনওই ভুল প্রমানিত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিটা নতুন ফসিল আবিষ্কার বিবর্তন তত্ত্বের জন্য একটি পরীক্ষা। একটি ফসিলও যদি বিবর্তনের ধারার বাইরে পাওয়া যায় সেই মাত্র তত্ত্বটি ভুল বলে প্রমানিত হবে। একবার বিজ্ঞানী জেবি এস হালডেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কিভাবে বিবর্তনকে ভুল প্রমাণ করা যায়? উত্তরে হালডেন বলেছিলেন,

কেউ যদি প্রক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল খুঁজে পায়।

বলা বাহুল্য এ ধরনের কোন ফসিলই এ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয় নি। না হওয়ারই কথা, কারণ বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের যে ধারাটি আমাদের দিয়েছেন তা হল :
মাছ –> উভচর –> সরীসৃপ –> স্তন্যপায়ী প্রানী।

খরগোশ যেহেতু একটি পুরোপুরি স্তন্যপায়ী প্রাণী, সেহেতু সেটি বিবর্তিত হয়েছে অনেক পরে এবং বিভিন্ন ধাপে (মাছ থেকে উভচর, উভচর থেকে সরিসৃপ এবং সরিসৃপ থেকে শেষ পর্যন্ত খরগোশ), তাই এতে সময় লেগেছে বিস্তর। প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল পাওয়ার কথা নয়, কারণ বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী এ সময় (প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগে) থাকার কথা কতকগুলো আদিম সরল প্রাণ – যেমন নিলাভ সবুজ শৈবাল, সায়নোব্যকটেরিয়া ইত্যাদি (ফসিল রেকর্ডও তাই বলছে)। আর স্তন্যপায়ী প্রাণীর উদ্ভব ঘটেছে ট্রায়োসিক যুগে (প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগ শেষ হওয়ার ৩০ কোটি বছর পরে)। কাজেই কেউ সেই প্রিক্যাম্বরিয়ান যুগে খরগোশের ফসিল খুঁজে পেলে তা সাথে সাথেই বিবর্তনতত্ত্বকে নস্যাৎ করার জন্য যথেষ্ট হত।

তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্য থাকে, এর মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যত আবিষ্কার সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারি। বিবর্তন তত্ত্ব সুচারুভাবে এই দায়িত্ব পালন করে। যেমন, আধুনিক পিঁপড়াদের পূর্বপুরুষের ফসিল কোথা থেকে পাওয়া যাবে সেইটা বিবর্তন তত্ত্ব দিয়ে বের করে সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। এছাড়াও তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ন সকল ভবিষ্যতবাণীর তালিকা পাওয়া যাবে এখনে- http://tinyurl.com/4bh3n

আবার আসা যাক, নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে। আগেই বলেছি, বর্তমান পর্যন্ত সকল আহোরিত জ্ঞান দিয়ে আঘাত করার মাধ্যমে একটি অনুমিত তত্ত্বকে তত্ত্বের মর্যাদা দান করা যায়। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত গাছ থেকে আপেল পড়া বাস্তবতাটিকে ব্যাখ্যায় নিউটনের তত্ত্বই সঠিক ফলাফল দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে আবিষ্কৃত বিশেষ কিছু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেল, নিউটনের তত্ত্ব সঠিক ফলাফল দিতে পারছেনা, যা পারছে আইনস্টানের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। সুতরাং এখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বই গ্রহণযোগ্য। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন, গাছ থেকে আপেল পড়ার ব্যাখ্যা যাই দিয়েই দেওয়া হোকনা কেন, আপেল পড়া কিন্তু থেমে যায়নি। বিবর্তনও তাই। পাহাড় সমান প্রমানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত যে, পৃথিবীর সকল প্রজাতিত উদ্ভব বিবর্তনের মাধ্যমে হয়েছে। এটি সূর্য পৃথিবী চারদিকে ঘোরে, গাছ থেকে আপেল পড়ার মতোই বাস্তবতা। এই বাস্তবতাটি ডারউইনের তত্ত্ব দিয়ে এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে ব্যাখ্যা যাচ্ছে, ভবিষ্যতের কোনও পরিস্থিতিতে ডারউইনের তত্ত্ব যদি সঠিক ফলাফল দিতে অপারগ হয় তাহলে আমরা আরও সঠিক কোনও ব্যাখ্যার সন্ধান পাবো, কিন্তু গাছ থেকে আপেল পড়ছিল, পড়ছে এবং পড়তে থাকবে, বিবর্তনও হয়েছিল, হচ্ছে, হতেই থাকবে।

মুক্তমনায় প্রকাশিত- http://mukto-mona.com/banga_blog/?p=4823


Leave a Comment »

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

    গুগলান …

    মোর খোমা

    নিজের কথা নিজেই বলি

    গভীর সমুদ্রের মধ্যভাগের এক দ্বীপে আটকে থাকা একজন মানুষকে উদ্ধারের আশায় তীর থেকে ভাঙা তরী ভাসিয়ে তার মাঝে বসে থেকে চুরুট টানা মানুষ আমি। স্বপ্ন দেখি অনেক, অলসতায় যার প্রায় সবটুকু স্বপ্নই থেকে যায়।

    ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (আইইউটি) থেকে তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশলে স্নাতক। দেশের গরীব জনগনকে সল্পমূল্যে চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছে দেবার ইচ্ছায় গবেষণারত সিদ্দিক- ই- রব্বানী স্যারের সাথে কাজ করি এখন। গালভরা একটা নামও আছে অবশ্য এই কাজের। বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলোজি বিভাগের পিএইচডি গবেষক (!!)।

    ব্লগজগতে আছি প্রায় তিনবছর। "বস" লেখক না হয়েও "বস" লেখকদের একটা স্বভাব এখন আমারও হয়েছে। লিখতে আর ভালো লাগেনা।

    বিষয়বস্তু

    গুঁতাশুমারি

    • 425 টি

    RSS ফিড

    RSS Feed

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.